বেনফিকা ০–১ রিয়াল মাদ্রিদ: ভিনিসিয়াসের গোলেই লিসবনে নাটকীয় জয়
২০২৫-২৬ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ প্লে-অফ: বেনফিকা ০–১ রিয়াল মাদ্রিদ | লিসবনে ভিনিসিয়াসের জাদু
ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চ UEFA চ্যাম্পিয়ন্স লিগ–এর ২০২৫-২৬ মৌসুমের প্লে-অফ পর্বে এক উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় পর্তুগালের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব বেনফিকা এবং স্পেনের রেকর্ড চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদ। ১৭/১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, লিসবনের ঐতিহাসিক এস্তাদিও দা লুজ–এ অনুষ্ঠিত ম্যাচে নির্ধারিত সময় শেষে ১-০ গোলে জয় তুলে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ। ম্যাচের একমাত্র গোলটি করেন ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিয়াস জুনিয়র।
এই ম্যাচটি ছিল কেবল একটি ফুটবল লড়াই নয়; বরং কৌশল, মানসিক দৃঢ়তা ও কিছু বিতর্কিত মুহূর্তের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ইউরোপীয় নাটক।
ম্যাচের সারসংক্ষেপ
ফাইনাল স্কোর:
বেনফিকা ০
রিয়াল মাদ্রিদ ১
গোল স্কোরার:
ভিনিসিয়াস জুনিয়র (৫০’)
প্রথমার্ধে দুই দলই সতর্কভাবে খেলে। বল দখলে রিয়াল কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বেনফিকার রক্ষণভাগ সংগঠিত ছিল। তবে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়।
গোলের মুহূর্ত: ভিনিসিয়াসের শৈল্পিক সমাপ্তি
৫০তম মিনিটে বক্সের বাম দিক থেকে বল পেয়ে ভিনিসিয়াস দ্রুত ভেতরে কাট করেন। দুই ডিফেন্ডারকে পাশ কাটিয়ে ডান পায়ে নেওয়া তার বাঁকানো শট সরাসরি জালে গিয়ে লাগে। গোলরক্ষক ছুঁতে পারলেও ঠেকাতে পারেননি।
এই গোলটি শুধু স্কোরবোর্ডেই পার্থক্য গড়েনি, বরং ম্যাচের মানসিক গতিপথও বদলে দেয়। গোলের পর রিয়াল মাদ্রিদ আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে, আর বেনফিকা চাপ বাড়াতে গিয়ে ছন্দ হারায়।
বিতর্ক ও উত্তেজনা
ম্যাচটি আলোচনায় আসে কিছু বিতর্কিত ঘটনার জন্যও:
বর্ণবাদ নিয়ে অভিযোগ
গোলের পর ভিনিসিয়াস অভিযোগ করেন যে প্রতিপক্ষের একজন খেলোয়াড় তাঁর প্রতি বর্ণবাদী মন্তব্য করেছেন। বিষয়টি রেফারির নজরে আসলে খেলা প্রায় ১০ মিনিটের জন্য বন্ধ থাকে। ইউরোপীয় ফুটবলে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।
কোচের বহিষ্কার
বেনফিকার ডাগআউটে উত্তেজনা চরমে ওঠে। রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিবাদ করায় কোচ দ্রুত দুটি হলুদ কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। এই ঘটনায় দলটির কৌশলগত স্থিরতা কিছুটা নড়বড়ে হয়ে যায়।
উদযাপনে হলুদ কার্ড
গোল উদযাপনের সময় অতিরিক্ত আবেগ দেখানোর জন্য ভিনিসিয়াসকেও সতর্ক করা হয়। তবে এতে তার পারফরম্যান্সে কোনো প্রভাব পড়েনি।
ট্যাকটিক্যাল বিশ্লেষণ
রিয়াল মাদ্রিদ
রিয়াল মাদ্রিদ ৪-৩-৩ ফরমেশনে মাঠে নামে। মাঝমাঠে দ্রুত পাসিং ও উইং দিয়ে আক্রমণ ছিল তাদের প্রধান অস্ত্র। ডিফেন্সিভ ট্রানজিশনে দলটি অত্যন্ত সংগঠিত ছিল। গোলের পর তারা খেলার গতি নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং কাউন্টার-অ্যাটাকে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
বেনফিকা
বেনফিকা তুলনামূলকভাবে রক্ষণাত্মক কৌশল নেয়। প্রথমার্ধে তারা সফল হলেও দ্বিতীয়ার্ধে চাপ সামলাতে ব্যর্থ হয়। আক্রমণভাগে ফিনিশিংয়ের ঘাটতি স্পষ্ট ছিল।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
বেনফিকা ও রিয়াল মাদ্রিদের ইউরোপীয় ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। ১৯৬২ সালের ইউরোপীয় কাপ ফাইনালে বেনফিকা ৫-৩ ব্যবধানে রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল—যা আজও ক্লাসিক ম্যাচ হিসেবে স্মরণীয়।
এই মৌসুমের আগের একটি গ্রুপ ম্যাচেও বেনফিকা জয় পেয়েছিল। ফলে প্লে-অফে এই লড়াই ছিল প্রতিশোধ ও মর্যাদার প্রশ্নে আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
দ্বিতীয় লেগের আগে পরিস্থিতি
১-০ ব্যবধান বড় নয়, তবে অ্যাওয়ে লেগে জয় রিয়ালের জন্য বড় সুবিধা। দ্বিতীয় লেগ অনুষ্ঠিত হবে মাদ্রিদে, যেখানে হোম সমর্থনের শক্তি রিয়ালকে আরও আত্মবিশ্বাসী করবে।
অন্যদিকে, বেনফিকার সামনে চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট—একটি গোল শোধ করে ম্যাচে ফিরতে হবে এবং রক্ষণে আরও দৃঢ় হতে হবে।
সামাজিক বার্তা ও মানবিক দিক
এই ম্যাচটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে ফুটবল কেবল গোল আর জয়ের খেলা নয়। বর্ণবাদের অভিযোগ ও তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে—আধুনিক ফুটবল সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়েও সচেতন। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
উপসংহার
লিসবনের রাতে রিয়াল মাদ্রিদের ১-০ জয় হয়তো স্কোরলাইনে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু প্রভাবের দিক থেকে এটি ছিল বিশাল। ভিনিসিয়াস জুনিয়রের গোল, কৌশলগত শৃঙ্খলা এবং মানসিক দৃঢ়তা দলটিকে এগিয়ে রাখল।
অন্যদিকে, বেনফিকার জন্য এটি সতর্কবার্তা—দ্বিতীয় লেগে ঘুরে দাঁড়াতে হলে নিখুঁত পারফরম্যান্স প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ম্যাচটি ছিল উত্তেজনা, কৌশল ও আবেগের মিশেলে একটি স্মরণীয় ইউরোপীয় রাত—যা ফুটবলপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকবে।
