আর্জেন্টিনা বনাম অস্ট্রিয়া ২-০: মেসির জোড়া গোলে নকআউটে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা|ফুটবল নিউজ বাংলা
মেসির জাদুতে নকআউট নিশ্চিত: অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপ মিশনে আরও শক্তিশালী আর্জেন্টিনা
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘জে’-এর ম্যাচটি ছিল শুধুমাত্র তিন পয়েন্টের লড়াই নয়; এটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসির আরেকটি মহাকাব্য রচনার রাত। ডালাসের উচ্ছ্বসিত দর্শকদের সামনে অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে পরাজিত করে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আর এই জয়ের কেন্দ্রে ছিলেন সেই পরিচিত নাম লিওনেল মেসি।
একটি পেনাল্টি মিস দিয়ে ম্যাচ শুরু করেও শেষ পর্যন্ত জোড়া গোল করে তিনি প্রমাণ করেছেন কেন তাকে এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যাচ উইনারদের একজন বলা হয়।
শুরুতেই ধাক্কা, তারপর মেসির প্রত্যাবর্তন
ম্যাচের প্রথম ১৫ মিনিটেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে আর্জেন্টিনা। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং রদ্রিগো ডি পল বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে রাখেন।
এই চাপের ফলেই পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। পুরো স্টেডিয়াম যখন গোল উদযাপনের জন্য প্রস্তুত, তখন অবিশ্বাস্যভাবে সুযোগ হাতছাড়া করেন মেসি। তার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
কিন্তু এখানেই মেসির শ্রেষ্ঠত্ব। অনেক খেলোয়াড় এমন মুহূর্তে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। মেসি ঠিক উল্টোটা করেন। পেনাল্টি মিসের পর থেকেই তিনি আরও বেশি বল চাওয়া শুরু করেন, আরও বেশি আক্রমণ গড়েন এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রাখেন।
ট্যাকটিক্যাল লড়াইয়ে স্কালোনির মাস্টারপ্ল্যান
আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি এই ম্যাচে ৪-৩-৩ ফরমেশনে দল সাজান। তবে বল দখলে থাকলে দলটি কার্যত ৩-২-৫ কাঠামোয় রূপ নেয়।
নাহুয়েল মোলিনা এবং নিকোলাস তাগলিয়াফিকো দুই উইং থেকে ক্রমাগত ওপরে উঠে অস্ট্রিয়ার ডিফেন্সকে চওড়া করে দেন। ফলে মাঝখানে মেসি ও লাউতারো মার্তিনেসের জন্য জায়গা তৈরি হয়।
অস্ট্রিয়া শুরুতে ৪-২-৩-১ ফরমেশনে রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলা বজায় রাখলেও আর্জেন্টিনার পজিশনাল রোটেশন তাদের পরিকল্পনা ভেঙে দেয়।
বিশেষ করে রদ্রিগো ডি পলের প্রেসিং এবং ম্যাক অ্যালিস্টারের বল বিতরণ অস্ট্রিয়ার মিডফিল্ডকে ম্যাচজুড়ে সমস্যায় ফেলে।
ইতিহাস গড়া গোল
ম্যাচের ৩৮তম মিনিটে আসে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত।
দারুণ এক দলীয় আক্রমণে ডি পলের কাছ থেকে বল পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকে পড়েন মেসি। এরপর তার স্বভাবসুলভ বাঁ পায়ের নিখুঁত শট অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষকের নাগালের বাইরে চলে যায়।
গোলটি ছিল শুধু ম্যাচের প্রথম গোল নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসে তার গোলসংখ্যাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আরেকটি মাইলফলক।
গোলের পর মেসির উদযাপন ছিল আবেগঘন। সতীর্থরা তাকে ঘিরে ধরেন, আর গ্যালারিতে থাকা হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থক গর্জে ওঠেন আনন্দে।
মাঝমাঠে আর্জেন্টিনার পূর্ণ আধিপত্য
এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল তাদের মিডফিল্ডের নিয়ন্ত্রণ।
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান
বল দখল: আর্জেন্টিনা ৬৩% – ৩৭% অস্ট্রিয়া
মোট শট: আর্জেন্টিনা ১৭
লক্ষ্যে শট: ৮
অস্ট্রিয়ার লক্ষ্যে শট: ২
কর্নার: আর্জেন্টিনা ৭
সফল পাস: ৬০৮
পাসিং নির্ভুলতা: ৯০%
এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে ম্যাচে আর্জেন্টিনার কতটা আধিপত্য ছিল।
এনজো ফার্নান্দেজ ৯৩% পাস সফল করেন, আর ম্যাক অ্যালিস্টার তৈরি করেন একাধিক গোলের সুযোগ।
এমিলিয়ানো মার্তিনেস: নীরব নায়ক
মেসি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলেও গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেসের অবদানও ছিল অসাধারণ।
দ্বিতীয়ার্ধে মার্সেল সাবিৎসার এবং ক্রিস্টোফ বাউমগার্টনারের দুটি বিপজ্জনক প্রচেষ্টা দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন তিনি।
যখনই অস্ট্রিয়া ম্যাচে ফেরার আশা দেখিয়েছে, তখনই দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন মার্তিনেস।
বিশ্বকাপের বড় ম্যাচে তার মানসিক দৃঢ়তা আবারও আর্জেন্টিনার জন্য বড় সম্পদ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
বদলি খেলোয়াড়দের ইতিবাচক প্রভাব
দ্বিতীয়ার্ধে স্কালোনি জুলিয়ান আলভারেজকে মাঠে নামিয়ে আক্রমণে নতুন গতি আনেন।
আলভারেজের প্রেসিং অস্ট্রিয়ার ডিফেন্ডারদের ভুল করতে বাধ্য করে। একইসঙ্গে তার দৌড় এবং অফ-দ্য-বল মুভমেন্ট মেসির জন্য অতিরিক্ত জায়গা তৈরি করে দেয়।
ফলে শেষ ২০ মিনিটে আর্জেন্টিনা আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
যোগ করা সময়ে শেষ আঘাত
অস্ট্রিয়া যখন শেষ মুহূর্তে সমতার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছিল, তখনই আসে মেসির শেষ হাসি।
যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক থেকে বল পান তিনি। সামনে শুধু গোলরক্ষক।
মেসি কোনো তাড়াহুড়ো করেননি।
নিজের অসাধারণ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে স্কোরলাইন ২-০ করেন।
পুরো স্টেডিয়াম তখন দাঁড়িয়ে করতালি দেয়।
এটি ছিল শুধু ম্যাচের দ্বিতীয় গোল নয়; এটি ছিল এক কিংবদন্তির আরেকটি স্বাক্ষর।
মেসির ম্যাচ রেটিং
| বিভাগ | পরিসংখ্যান |
|---|---|
| গোল | ২ |
| শট | ৬ |
| লক্ষ্যে শট | ৪ |
| কী পাস | ৫ |
| সফল ড্রিবল | ৪ |
| ম্যাচ রেটিং | ৯.৭/১০ |
৩৯ বছর বয়সেও মেসি যেভাবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করছেন, তা ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক বিরল অভিজ্ঞতা।
নকআউট নিশ্চিত, শিরোপা ধরে রাখার বার্তা
প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারানোর পর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও জয় তুলে নেওয়ায় আর্জেন্টিনার পয়েন্ট এখন ৬।
এক ম্যাচ হাতে রেখেই তারা নিশ্চিত করেছে শেষ ষোলোতে জায়গা।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দলটি এখনও তাদের সেরা ছন্দে পৌঁছায়নি। তবুও তারা প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করে জয় তুলে নিচ্ছে।
এটাই বড় দলের পরিচয়।
উপসংহার
পেনাল্টি মিস দিয়ে শুরু, ইতিহাস গড়া গোল, তারপর জোড়া আঘাতে ম্যাচ শেষ লিওনেল মেসির জন্য এটি ছিল আরেকটি স্মরণীয় বিশ্বকাপ রাত।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা দেখিয়ে দিয়েছে কেন তারা এখনও শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার। রক্ষণে দৃঢ়তা, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণে মেসির জাদু সবকিছু মিলিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের যাত্রা এগিয়ে চলেছে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে।
যদি এই ছন্দ অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০২৬ বিশ্বকাপেও আকাশি-সাদা জার্সিধারীদের থামানো যে কোনো দলের জন্যই অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে। আর মেসি? তিনি যেন এখনও লিখে চলেছেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়গুলোর একটি।
