ফারহানের সেঞ্চুরি, ২১২ রান—তবুও বাদ! শ্রীলঙ্কা বনাম পাকিস্তান সুপার এইট ম্যাচের নাটকীয় বিশ্লেষণ
শ্রীলঙ্কা বনাম পাকিস্তান: রেকর্ড জুটি, ৪১৯ রানের থ্রিলার, তবু সেমিফাইনালে উঠতে পারল না পাকিস্তান | T20 World Cup 2026 সুপার এইট বিশ্লেষণ
এশিয়ার দুই দল শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তান সুপার এইট পর্বে গ্রুপ–২ এর ৫০তম ম্যাচে মুখোমুখি হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ক্যান্ডির পাল্লেকেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম-এ অনুষ্ঠিত এই ম্যাচটি ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম হাই-ভোল্টেজ লড়াই। পাকিস্তানের জন্য এটি ছিল ‘ডু অর ডাই’ ম্যাচ শুধু জয় নয়, এই ম্যাচে বড় ব্যবধানে জয় ছিল সেমিফাইনালের সমীকরণে টিকে থাকার শর্ত।
ম্যাচ সারসংক্ষেপ এক নজরে
পাকিস্তান: ২১২/৮ (২০ ওভার)
শ্রীলঙ্কা: ২০৭/৬ (২০ ওভার)
ফলাফল: পাকিস্তান জয়ী ৫ রানে
ম্যান অব দ্য ম্যাচ (অনুমিত): সাহিবজাদা ফারহান
টস ও কৌশল: শুরুর চালেই ম্যাচের গতি
শ্রীলঙ্কা টস জিতে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নেয়। সুপার এইট পর্যায়ে রান তাড়া করে জেতার ট্রেন্ড এবং রাতের শিশির দুই বিবেচনাতেই সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক ছিল। কিন্তু পাকিস্তান ব্যাটিংয়ে নেমে যে আগ্রাসী সূচনা করে, তাতে ম্যাচের গতি দ্রুত বদলে যায়।
পাকিস্তানের ইনিংস: রেকর্ড-গড়া ওপেনিং, ২১২ রানের পাহাড়
পাকিস্তানের ইনিংসের ভিত্তি গড়ে দেন দুই ওপেনার সাহিবজাদা ফারহান ও ফখর জামান। পাওয়ারপ্লেতে ঝড়ো ব্যাটিং করে তারা শ্রীলঙ্কার বোলিং আক্রমণকে চাপে ফেলে দেন।
ফারহানের সেঞ্চুরি ক্লাস ও কন্ট্রোল
ফারহান ৬০ বলে ১০০ রানের ইনিংস খেলেন (৫ ছয়, ৯ চার)। তার ব্যাটিংয়ে ছিল টাইমিং, গ্যাপ খোঁজা এবং ইনিংস গড়ার পর সচেতন ত্বরান্বিত করা টি-টোয়েন্টির আদর্শ ব্লুপ্রিন্ট। মিডল ওভারগুলোতে স্পিনারদের বিপক্ষে ফুটওয়ার্ক ব্যবহার করে তিনি স্ট্রাইক রোটেশন বজায় রাখেন।
ফখরের পাওয়ার-হিটিং
ফখর ৪২ বলে ৮৪ রান করে রানরেট ১০–এর ওপরে ধরে রাখেন। শর্ট বলকে পুল ও ফ্ল্যাট ব্যাটে কভার দিয়ে তার আক্রমণ ছিল পরিকল্পিত। দু’জন মিলে ১৭৬ রানের জুটি গড়ে সুপার এইটের অন্যতম সেরা ওপেনিং পার্টনারশিপ উপহার দেন।
তবে শেষ চার ওভারে দ্রুত উইকেট পড়ায় পাকিস্তান ২২০–এর কাছাকাছি যেতে পারেনি। ডেথ ওভারে স্লোয়ার ও ইয়র্কার মিশিয়ে শ্রীলঙ্কা কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। তবুও ২১২/৮ নকআউট সমীকরণে যথেষ্ট শক্ত স্কোর।
শ্রীলঙ্কার রানতাড়া: শানাকার পাল্টা-ঝড়ে শেষ পর্যন্ত লড়াই
রান তাড়া করতে নেমে শুরুর ধাক্কায় পড়ে শ্রীলঙ্কা। কিন্তু অধিনায়ক Dasun Shanaka ইনিংসের মোড় ঘুরিয়ে দেন।
শানাকার ৩১ বলে ৭৬
শানাকা তিন ছয় ও একাধিক চার হাঁকিয়ে ম্যাচকে শেষ ওভার পর্যন্ত নিয়ে যান। তার ব্যাটিংয়ে ছিল ম্যাচ সেন্স কখন আক্রমণ, কখন স্ট্রাইক রোটেশন। বিশেষ করে ১৬–১৮তম ওভারে বাউন্ডারির ঝড় তুলে সমীকরণ সহজ করেন।
রথনায়াকের কার্যকর সাপোর্ট
মিডল অর্ডারে ৩৭ বলে ৫৮ রানের ইনিংস দলকে ভরসা দেয়। পাকিস্তানের পেসাররা লেংথ পরিবর্তন ও ওয়াইড ইয়র্কার কৌশল নিলেও, শ্রীলঙ্কা নিয়মিত বাউন্ডারি তুলে চাপ ধরে রাখে।
শেষ ওভারে প্রয়োজন ছিল ১২ রান। স্নায়ুচাপের মুহূর্তে পাকিস্তানি বোলাররা লাইন-লেংথ ধরে রাখায় শ্রীলঙ্কা ২০৭/৬-এ থামে মাত্র ৫ রানে জয় পায় পাকিস্তান।
ডিপ অ্যানালাইসিস: কেন জিতেও সেমিফাইনালে নয়?
এই জয় সত্ত্বেও পাকিস্তান সেমিফাইনালে উঠতে পারেনি। কারণ ছিল নেট রান রেট (NRR)। সুপার এইটে সমান পয়েন্টে থাকায় নেট রান রেটই নির্ধারণ করে শেষ চারের দল। শ্রীলঙ্কা ২০৭ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ায় পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় বড় ব্যবধানের জয় অর্জিত হয়নি। ফলে গ্রুপ–২ থেকে নিউজিল্যান্ড এগিয়ে যায়।
কৌশলগত শিক্ষা
ডেথ ওভারে ১০–১৫ রান কম: শেষ চার ওভারে ৪০–৪৫ তুলতে পারলে সমীকরণ বদলাতে পারত।
মিডল ওভারে উইকেটের অভাব: ৮–১৪ ওভারে শ্রীলঙ্কাকে চেপে ধরতে না পারায় রানরেট নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি।
ফিল্ডিং মিসচান্স: দুটি হাফ-চান্স মিস হওয়ায় ম্যাচ শেষ ওভার পর্যন্ত গড়ায়।
টুর্নামেন্ট প্রভাব ও ভবিষ্যৎ দিশা
পাকিস্তানের জন্য এটি ছিল আবেগঘন সমাপ্তি—রেকর্ড-গড়া জুটি, ৪১৯ রানের থ্রিলার, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেমিফাইনাল নয়। ইতিবাচক দিক হলো টপ-অর্ডারের ফর্ম ও পাওয়ারপ্লে আধিপত্য। উন্নতির জায়গা ডেথ বোলিংয়ের ধারাবাহিকতা ও ফিল্ডিং স্ট্যান্ডার্ড।
শ্রীলঙ্কাও দেখিয়েছে লড়াইয়ের মানসিকতা। বড় লক্ষ্য তাড়া করে ২০০–এর ওপরে পৌঁছানো তাদের ব্যাটিং গভীরতার প্রমাণ। ভবিষ্যতে পাওয়ারপ্লেতে উইকেট সংরক্ষণ ও স্পিনের ভ্যারিয়েশন বাড়াতে পারলে তারা আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে।
উপসংহার
শ্রীলঙ্কা বনাম পাকিস্তান ম্যাচটি সুপার এইটের মানচিত্রে এক ক্লাসিক সংযোজন—
পাকিস্তানের ২১২/৮, রেকর্ড ওপেনিং জুটি
শানাকার পাল্টা-ঝড়ে ২০৭/৬
নাটকীয় ৫ রানের ফল
নেট রান রেটের কঠিন বাস্তবতা
ক্রিকেটে কখনও কখনও জয়ই যথেষ্ট নয় সমীকরণও জিততে হয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের এই ম্যাচ সেই শিক্ষাই দিয়ে গেল।
