চাকরির পাশাপাশি নিয়মিত খেলার পরিকল্পনা
চাকরির পাশাপাশি নিয়মিত খেলার পরিকল্পনা: ব্যস্ত জীবনে সুস্থ থাকার কার্যকর উপায়
বর্তমান কর্মব্যস্ত জীবনে দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজের চাপে অনেকেই নিজেদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার প্রতি প্রয়োজনীয় যত্ন নিতে পারেন না। অফিসের ডেডলাইন, ট্রাফিক, পরিবার–সব মিলিয়ে নিয়মিত খেলাধুলা বা ব্যায়াম অনেকের কাছেই যেন অসম্ভব এক কাজ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—নিয়মিত শরীরচর্চা শুধু সুস্থ থাকতে সাহায্য করে না, বরং কাজের উৎপাদনশীলতা, মানসিক সতেজতা, মনোযোগ ও জীবনযাত্রার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। তাই চাকরির পাশাপাশি সামান্য পরিকল্পনাতেই নিয়মিত খেলার অভ্যাস গড়ে তোলা সম্পূর্ণ সম্ভব।
কেন চাকরির পাশাপাশি নিয়মিত খেলা জরুরি?
১. স্ট্রেস কমায়: প্রতিদিনের ব্যস্ততা ও কাজের চাপ শরীর ও মনের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। নিয়মিত খেলার মাধ্যমে শরীর থেকে এন্ডরফিন নিঃসরণ হয়, যা স্বাভাবিকভাবে স্ট্রেস কমায় এবং মনকে হালকা করে।
২. শরীর সুস্থ থাকে: দীর্ঘ সময় ডেস্কে বসে কাজ করলে কোমর ব্যথা, ঘাড় ব্যথা, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। নিয়মিত খেলাধুলা এ সকল সমস্যা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
৩. মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়ে: শরীরচর্চার ফলে মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালন বাড়ে, ফলে কাজের গতি, মনোযোগ ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
৪. ঘুমের মান উন্নত হয়: ব্যায়াম বা খেলা শরীরকে ক্লান্ত করে কিন্তু মানসিকভাবে প্রশান্ত করে। ফলে রাতে ঘুম আরও গভীর ও আরামদায়ক হয়।
-
সামাজিক সংযোগ বাড়ে: কোনো দলগত খেলা (যেমন ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন) খেললে সামাজিক বন্ধন তৈরি হয়, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিভাবে চাকরির পাশাপাশি নিয়মিত খেলার পরিকল্পনা করবেন?
১. সময় নির্ধারণই প্রধান কৌশল
অনেকেই ভাবে, সময় পাচ্ছি না—এটাই সবচেয়ে বড় বাধা। কিন্তু বাস্তবে সময় বের করা যায়।
আপনি সকালে হালকা ৩০ মিনিট দৌড়, সাইক্লিং কিংবা ব্যাডমিন্টন খেলতে পারেন। সকাল না হলে অফিস থেকে ফেরার পর যে কোনো কাছের মাঠ বা জিমে গিয়ে শারীরিক পরিশ্রম করা সম্ভব।
সময় বাঁচাতে পারেন এভাবে—
-
কাজের আগে ভোরে ২০-৩০ মিনিটের খেলা বা ব্যায়াম
-
অফিস শেষে সপ্তাহে ৩ দিন ১ ঘণ্টার খেলা
-
ছুটির দিনে দীর্ঘ সময়ের অনুশীলন বা খেলা
সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট খেলার অভ্যাস স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন। এটি দিনে মাত্র ২০–২৫ মিনিট।
২. পছন্দসই খেলা বেছে নিন
যে খেলার প্রতি আপনার আগ্রহ আছে সেটাই বেছে নিন। খেলাধুলা যদি আনন্দদায়ক হয়, সেটি নিয়মিত করা সহজ হয়।
পছন্দ অনুযায়ী খেলাগুলো হতে পারে—
-
দৌড়ানো বা জগিং
-
ক্রিকেট বা ফুটবল
-
ব্যাডমিন্টন
-
সাঁতার
-
সাইক্লিং
-
টেবিল টেনিস
-
জিমে ব্যায়াম
-
যোগব্যায়াম
ব্যস্ত জীবনেও ২০–৩০ মিনিটের ব্যাডমিন্টন বা সাইক্লিং অনায়াসে করা যায়।
৩. ছোট লক্ষ্য রাখুন, ধীরে ধীরে বাড়ান
প্রথম দিন থেকেই বেশি সময় ধরে বা অনেক পরিশ্রম করা উচিত নয়। এতে বিরক্তি বা ক্লান্তি এসে অভ্যাস ভেঙে যেতে পারে। তাই—
-
প্রথম সপ্তাহ: দিনে মাত্র ১৫ মিনিট
-
দ্বিতীয় সপ্তাহ: ২০–২৫ মিনিট
-
তার পর থেকে: ৩০ মিনিট বা বেশি
ধীরে ধীরে বাড়ালে শরীর অভ্যস্ত হয় এবং খেলার প্রতি আগ্রহ বাড়ে।
৪. অফিসে সামান্য শারীরিক নড়াচড়ার অভ্যাস
যদি কাজের সময় দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হয়, তখন অফিসেই কিছু ছোটখাটো ব্যায়াম করা যেতে পারে—
-
প্রতি ১ ঘণ্টায় ২–৩ মিনিট হাঁটা
-
সিঁড়ি ব্যবহার করা
-
লিফট পরিহার করে কিছু তলা উঠা
-
ডেস্কে বসেই স্ট্রেচিং
এসব ছোট অভ্যাস শরীরকে সক্রিয় রাখে এবং আপনাকে খেলায় আরও প্রস্তুত করে।
৫. সঙ্গী বা গ্রুপ তৈরি করুন
একসাথে খেলার পরিকল্পনা করলে নিয়মিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। অফিসের সহকর্মী, প্রতিবেশী বা বন্ধুদের সঙ্গে একটি দল করে সপ্তাহে ২-৩ দিন খেলার পরিকল্পনা করতে পারেন। গ্রুপে খেললে—
-
অনুপ্রেরণা বাড়ে
-
খেলাটা আরও উপভোগ্য হয়
-
নিয়ম ভাঙা কঠিন হয়ে যায়
৬. ডায়েট ও পানির দিকেও নজর রাখুন
খেলাধুলার সাথে সঠিক খাদ্যগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি—
-
প্রচুর পানি পান করুন
-
ভাজা-পোড়া কমিয়ে দিন
-
শাকসবজি, ফলমূল, প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খান
-
চিনি কমিয়ে দিন
সুস্থ খাবার খেলতে আগ্রহ বাড়ায় এবং ক্লান্তি কমায়।
৭. সপ্তাহে অন্তত ১ দিন বিশ্রাম নিন
নিয়মিত খেলাধুলা যেমন জরুরি, তেমনি বিশ্রামও গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহে এক দিন শরীরকে আরাম দিন। এতে আঘাতের ঝুঁকি কমে এবং খেলায় শক্তি বাড়ে।
সর্বোপরি—নিজের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব আপনারই
চাকরির চাপে নিজেদের ভুলে যাওয়া ঠিক নয়। দিনের মাত্র ২০–৩০ মিনিট খেলা বা ব্যায়াম আপনার জীবনে বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে। শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি, কাজের উৎপাদনশীলতা এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান বাড়িয়ে দেয়।
সুতরাং, আজই একটি ছোট পরিকল্পনা নিন—চাকরির পাশাপাশি নিয়মিত খেলার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
স্বাস্থ্যই সম্পদ, আর এই সম্পদ গড়তে প্রতিদিন মাত্র অল্প সময়ই যথেষ্ট।
আরো পড়ুন: প্রতিদিন দৌড়ানো বনাম ফুটবল: কোনটা বেশি উপকারী?
